সরকার তাদের সুবিধামতো নির্বাচন কমিশন (ইসি) আইন করতে যাচ্ছে বলে মনে করে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো। মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেওয়া খসড়া ইসি আইনের বিষয়ে তাদের মূল্যায়ন হচ্ছে, এর পেছনে সরকারের ‘দুরভিসন্ধি’ রয়েছে। যে কারণে কারও সঙ্গে আলোচনা না করে ‘চুপিসারে’ আইনের খসড়া করা হয়েছে এবং ‘হঠাৎ’ বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। অথচ আইনের মাধ্যমে নতুন ইসি গঠনের দাবি ওঠার পর সরকার এত দিন ‘সময় নেই’ বলে আসছিল।


বিএনপিসহ চারটি রাজনৈতিক দল মনে করে, অনুগত নির্বাচন কমিশন গঠনের কাজটি এত দিন প্রশাসনিক কায়দায় হয়েছে, এখন একই কাজ আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে করবে সরকার।


গত সোমবার সকালে মন্ত্রিসভা ইসি আইনের খসড়া অনুমোদন দেয়। আর রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। ইসি আইনের বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির পক্ষে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, মন্ত্রিসভা যে খসড়া অনুমোদন করেছে, তা ‌‘অনুগত ও অপদার্থ’ নির্বাচন কমিশন গঠনের চলমান প্রক্রিয়াকে দলীয় স্বার্থে আইনি রূপ দেওয়ার সরকারি অপপ্রয়াস। এর ফলাফল হবে ‘যেই লাউ, সেই কদু’। তিনি বলেন, ‘সম্ভবত এবার সেটি হতে যাচ্ছে একটি পচা কদু এবং এটা পর্বতের মূষিকের চেয়ে বেশি কিছু প্রসব করবে না। এত দিন ধরে যেটা প্রশাসনিক কায়দায় হয়েছে, এখন সেটা আইনি কায়দায় হবে। আমরা এ জন্য বলেছি যে, যেই লাউ, সেই কদু।’


বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, এই আইনে কোনো নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, আইনজ্ঞ থাকতে পারবেন না। দুনিয়ার কোথাও এই নিয়ম নেই। সারা জীবন সরকারি আদেশ মেনে চলা যাঁদের অভ্যাস, সেই কর্মকর্তাদের নিয়ে এই কমিশন হবে। এ জন্যই এটা ‘যেই লাউ সেই কদু, বরং পচা কদু’। তিনি বলেন, এই সরকার ও তাদের গঠিত কোনো কমিশনের অধীন বিএনপি নির্বাচনে যাবে না।


নজরুল ইসলাম খান বলেন, বিএনপি মনে করে, নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও যোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের নৈতিক সামর্থ্য আছে শুধু একটি নির্বাচিত সরকারের।


সরকারের তৎপরতা ‘দুরভিসন্ধিমূলক’

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করে নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়নকে ‘দুরভিসন্ধিমূলক’ বলে মনে করে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। গতকাল এক বিবৃতিতে দলের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেছেন, বাংলাদেশে ক্রিয়াশীল সব রাজনৈতিক দল যখন নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়নের কথা বলছে, দেশের বিশিষ্ট নাগরিকেরা এই আইনের প্রয়োজনীয়তা এবং ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে দায়িত্ব পালনের দাবি জানিয়েছেন, তখন কাউকে না জানিয়ে কারও মতামত না নিয়ে চুপিসারে আইনের খসড়া অনুমোদন করা হয়েছে।


এই আইন ক্ষমতাসীনদের স্বার্থরক্ষায় ব্যবহৃত হবে বলে মনে করে বাসদ। দলটি সরকারের ‘অনৈতিক’ কৌশলের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, পুনরায় কীভাবে ক্ষমতায় যাওয়া যায়, এটি তারই নীলনকশা মাত্র।


‘সান্ত্বনা পুরস্কার’

প্রস্তাবিত ইসি আইনকে বিষয়ে ছেলেভোলানো ‘সান্ত্বনা পুরস্কার’ বলে উল্লেখ করেছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)। গতকাল এক বিবৃতিতে দলের সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, প্রস্তাবিত আইন অতীতের নীলনকশার সার্চ কমিটিকে আইনগত বৈধতা দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। সৎ, দক্ষ এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষাভিত্তিক ইসি গঠনে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন গঠনে প্যানেল তৈরির লক্ষ্যে যাচাই-বাছাই, গণবিজ্ঞপ্তি এবং গণশুনানির যে ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তার কোনোটাই সরকার বিবেচনায় নেয়নি।


এদিকে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলনও প্রস্তাবিত আইনের বিরোধিতা করে বলেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের তোয়াক্কা না করে নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়ন নতুন সংকট সৃষ্টি করবে। দলের আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছেন, নির্বাচনের সময় অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকার গঠনের ব্যবস্থা রেখে এবং সব রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে হবে।